বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:১৮ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ : সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে নিহত হয়েছেন পাঁচজন। আহত হয়েছেন আরও কয়েক ডজন। সংঘর্ষে চট্টগ্রামে তিনজন, ঢাকায় একজন এবং রংপুরে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন শিক্ষার্থী, একজন পথচারী এবং বাকি দুজনের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) বিকেলে এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, বগুড়া ও রাজশাহীতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে একজনের বুকে গুলির চিহ্ন রয়েছে। আজ মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে আহত কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে দুজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এর আগে বেলা তিনটার দিকে নগরের মুরাদপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্রধারীরা গুলি ছুড়লে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। নিহত দুজন হলেন মো. ফারুক (৩২) ও মো. ওয়াসিম (২২)। ফারুক ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী এবং ওয়াসিম চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র বলে জানা গেছে। দুজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, আন্দোলনের ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। এ ছাড়া আহত অন্তত ছয় থেকে সাতজন বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক নুজহাত ইমু বলেন, নিহত দুজনের মধ্যে ফারুকের বুকে গুলির চিহ্ন রয়েছে। বাকিজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর আগে চট্টগ্রাম নগরে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার ঘটে। এ সময় কয়েকজন অস্ত্রধারীকে গুলিবর্ষণ করতে দেখা যায়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয় বেলা সোয়া তিনটায় নগরের মুরাদপুরে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হামলা করেছেন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে সেখানে স্বজনেরা ভিড় করেন।
শিক্ষার্থীরা জানান, সোমবার বিভিন্ন স্থানে কোটা সংস্কার আন্দোলন কর্মসূচিতে হামলার প্রতিবাদে আজ বেলা সাড়ে তিনটায় কর্মসূচি ছিল চট্টগ্রামের ষোলশহর রেলস্টেশনে। তবে এর আগে থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে ষোলশহর রেলস্টেশনে অবস্থান নেন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এর মধ্যে খণ্ড খণ্ড জমায়েতে শিক্ষার্থীরা ষোলশহরের দিকে আসতে থাকেন। আসার পথে মুরাদপুরে একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুরুতে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করলেও পরে গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণ শুরু হয়। কয়েকজন অস্ত্রধারীকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। এ সময় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। পরে তাঁরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। এভাবে চলছে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া।
সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে নগরের ব্যস্ততম সিডিএ অ্যাভিনিউ সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আতঙ্কিত হয়ে সাধারণ মানুষ এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। শিক্ষার্থীদের কয়েকটি অংশ অলিগলিতে ঢুকে পড়লে সেখান থেকেও খুঁজে বের করে হামলা করা হয়েছে।
জানতে চাইলে ষোলশহর রেলস্টেশনে থাকা মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নূরুল আজিম ওরফে রনি বলেন, তাঁরা (আন্দোলনকারীরা) ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। ট্রেন অবরোধ করে মানুষের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছেন। এই আন্দোলন এখন আর কোটাবিরোধী আন্দোলন নেই। এ আন্দোলন জামায়াত-শিবিরের আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁরা এ আন্দোলন মোকাবিলা করবেন।
আন্দোলনে থাকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের জশদ জাকির নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘পূ্র্বঘোষণা অনুযায়ী আমাদের কর্মসূচি ছিল; কিন্তু ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নিজেদের মতো একই জায়গায় কর্মসূচি দেন। পরে আমরা মুরাদপুর এলাকায় অবস্থান করলে ছাত্রলীগ বিচ্ছিন্নভাবে আমাদের ওপর হামলা করে। এতে আমাদের পাঁচ থেকে ছয়জন আহত হয়েছেন।’
জশদ জাকির নামের ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘নামে ছাত্রলীগ হলেও এঁরা কেউ ছাত্রলীগের নন। অধিকাংশ টোকাই। তাঁদের হাতে অস্ত্র দেওয়া হয়েছে। গুলি করা হয়েছে।’
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) কাজী তারেক আজিজ বলেন, নগরের মুরাদপুরসহ যেসব স্থানে সংঘর্ষ হচ্ছে, সেখানে পুলিশ রয়েছে। বিস্তারিত কিছু বলা যাচ্ছে না। অস্ত্রধারীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকাশ্যে অস্ত্রধারী কেউ থাকলে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
রংপুরে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে মঙ্গলবার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুলিশ রাবার বুলেট ও কাদাঁনে গ্যাসের সেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক শিক্ষার্থী। নিহত আবু সাঈদ (২২) রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তাঁর বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা আন্দোলন সমন্বয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শরিফুল ইসলাম। দুপুর দুইটার দিকে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ প্রতিবেদন লেখার সময় বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সংঘর্ষ চলছিল। দুপুরে সংঘর্ষে আহত হন আবু সাঈদ। পরে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানান জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আশিকুল আরেফিন।
রাজধানীর ঢাকা কলেজের সামনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের মধ্যে এক যুবক নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটেছে। নিহত যুবককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর নাম–পরিচয় জানা যায়নি। পুলিশের নিউমার্কেট অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মো. রিফাতুল ইসলাম বলেছেন, বিকেলে ঢাকা কলেজের সামনের রাস্তায় এক দল লোককে এক ব্যক্তিকে পেটাতে দেখেছেন তাঁরা। পরে শুনেছেন তিনি ঢাকা মেডিকেলে মারা গেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া বলেন, ঢাকা কলেজের রাস্তা থেকে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে এক যুবককে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বয়স আনুমানিক ২৫ বছর।
ওই যুবকের পরনে জিন্সের প্যান্ট ও সাদা গেঞ্জি রয়েছে। তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তাঁর মাথায় আঘাত রয়েছে।
গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এর প্রতিবাদে আজ দুপুরে সায়েন্স ল্যাব এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। বেলা ২টার দিকে ওই মিছিলে হামলা চালান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এরপর থেকে ওই এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
ঢাকা কলেজ ফটকের সামনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা হাতে রামদা, রড, লোহার পাইপ, লাঠি নিয়ে অবস্থান নেন। খানিক দূরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। দুই পক্ষের মধ্যে ইট–পাটকেল নিক্ষেপ এবং পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলতে থাকে।
এর মধ্যে বিকেল সাড়ে ৫টার পর সেখানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে অন্তত চারজন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
পুরান ঢাকার আদালত এলাকায় কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) চার শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সংলগ্ন স্টার হোটেলের সামনে বিকেল সাড়ে৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী এক চা দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি তিন-চারটি গুলির শব্দ শুনেছি। অনেক ইটপাটকেল ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হতে দেখেছি। এ সময় সরকার সমর্থক কিছু নেতাকর্মীকে আদালত চত্বরেও অস্ত্র হাতে দেখা যায়। সরকার দলের কিছু নেতাকর্মীকে সিএমএম আদালতের সামনে দিয়ে রাজার দেউড়ি এলাকায় চলে যেতে দেখা যায়।
এরপর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিপুর সংখ্যক শিক্ষার্থী ফের মিছিল নিয়ে রায় সাহেব বাজারের দিক থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যান।
প্রত্যক্ষদর্শী আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, রাজধানীর পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা এ গুলি বর্ষণ করেছেন। এতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী ফেরদৌস, ১৭ ব্যাচের অন্তু, ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী অনিকসহ চারজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) নজরুল ইসলাম বলেন, গুলির খবর শুনেছি। তবে আমরা এক গ্রুপই মিছিল করতে দেখেছি। অন্য গ্রুপ দেখিনি।
মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে স্ট্যাম্প, লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা- ‘আন্দোলনে হামলা কেন? প্রশাসন জবাব চাই’, ‘কোটা না মেধা, মেধা, মেধা’, ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ, রাজপথসহ নানা স্লোগান দিতে থাকে।
এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রলীগের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির উদ্দেশ্যে দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে বাসে করে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যান। তবে আন্দোলকারী শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেওয়ায় পুরান ঢাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাসের সামনে শোডাউন দিতে দেখা যায়।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply